
সাবিনা শারমিন : আমার শাস্তি হোক, তুমি সুখে থেকো। আমি মিথ্যা বলি না, তুমিও সত্য কথা বলো।’’ কথাগুলো শুনতে সিনেমাটিক মনে হলেও আসলে কথাগুলো কোন সিনেমার ডায়লগ নয়। আদালতে খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি ক্ষত বিক্ষত করে হত্যাচেস্টা ও প্রেমে ব্যর্থ হওয়া খাদিজার ঘাতক বদরুল। কথাগুলোতে চিরাচরিত বাংলা ছায়াছবির কোন এক পরিণত প্রেমের ব্যর্থ নায়কের খেদোক্তির মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে বদরুল একজন ভিলেন। যে ভিলেন খাদিজাকে হত্যাচেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর খাদিজার সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া্র বিষয়টিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণের জন্য নায়কোচিত ডায়লগের আশ্রয় গ্রহণ করেছে ।
খুব স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় যে যৌনাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ না করতে পারার ব্যর্থতা চতুর বদরুলকে বিকারগ্রস্থ করে তুলেছে। সে বিকার ভয়ংকর দানবে পরিনত করেছে তাকে। খাদিজাকে শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের চোখের সামনে নির্দ্বিধায় ও নির্ভয়ে সাবলীলভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে সে । সবাই বলবে খাদিজাতো মরেনি ! খাদিজার এই বেঁচে যাওয়াটি আমাদের কাছে অবশ্যই অলৌকিক এবং অতিরিক্ত পাওয়া। যা অপ্রত্যাশিত হলেও কল্পণাতীত। এই বেঁচে যাওয়াকে কৌশল হিসেবে লুফে নিয়েছে ধূর্ত বদরুল। সে তাঁর নিজের জীবন বাঁচানোর কৌশল হিসেবে প্রেমের ডায়লগ দিয়ে আবেগ ঘন সিনেমেটিক কারিশমায় মানুষকে অনুভুতির ফাঁদে ফেলার জন্য ‘ঝোপ বুঝে কোপ’ ফেলার মতোই টোপ ফেলার চেষ্টা চালিয়েছে।
সমাজ সংসারে পুরুষ হিসেবে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া খাদিজা- রিশার হত্যাকারীরা ছোটবেলা থেকেই জেনে এবং ধরে নিয়েছে যে , প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি একজন পুরুষের পুরুষত্বের জন্য অবমাননাকর। এখনো সমাজ সংসার সংস্কৃতি তাদের শেখায় ‘স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত’। পুরুষরা সোনার আংটি । তাই সেটি বাঁকা হলেও অসুবিধা নেই। নারীর মন কিংবা ভালোবাসা নয় ,নারীর শরীরটি একটি দখলদারিত্বের বিষয়। প্রেম বা বিয়ে বন্ধনের একটি দস্তঘতে নারীর শরীর এবং সৌন্দর্য পুরুষের নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসে যায়।
আস্থা,ভালোবাসা,শ্রদ্ধা ও ত্যাগ দিয়ে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে অর্জন করতে হয় , এ কথা জানেনা আমাদের সংস্কৃতি। উচ্চশিক্ষিত হয়েও জানতেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরের স্বামী। তাই রুমানার শরীরের উপর উঠে বল প্রয়োগ করে চোখ তুলে নিয়েছে। অনেক সময় স্ত্রীর চেয়ে যোগ্যতা কম হলেও শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার কারণে নারীকে ভোগ দখলের সামাজিক স্বীকৃতি বা বৈধতা পায় পুরুষ । সে কারণে বদরুলরা বিয়ে তো দুরের কথা,একপাক্ষিক প্রেমের প্রস্তাবেও খাদিজাদের কোপানোর অধিকার পায় বলে মনে করে।
খাদিজাকে কোপানোর ভিডিওটি যখন প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলো ,তখন আমার মতো অনেকেই ভিডিওটি একবারে দেখতে পারিনি। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে,সাহস সঞ্চয় করে প্রস্তুতি নিয়ে এই নির্মম ভিডিওটি দেখতে হয়েছে। কথা হচ্ছে যে নির্মম ভিডিওটি সাধারণ মানুষ সাহস নিয়ে দেখতে পারছেনা, তা নাকি প্রেম ।”হয়তো কিছুই নাহি পাবো ,তবুও তোমায় আমি দূর থেকে ভালোবেসে যাবো” । ”খুব জানতে ইচ্ছে করে ,তুমি কি সেই আগের মতো আছো ,নাকি অনেক খানি বদলে গেছো” । আমরা প্রেম আর বিরহের এই রোমান্টিক গানগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। আমাদের সময়ে প্রেমপত্রে এই গানগুলো ছাড়া প্রেমপত্র মূল্য পেতোনা । এখন প্রেমে ব্যর্থ হলে আর গান গাওয়া আর কবিতার ব্যাপার স্যাপারই থাকেনা । এখানে মনের কোন ব্যকুলতা প্রেমের ক্ষেত্রে কাজ করছেনা। এখন সরাসরি যৌন কামনার প্রস্তাবকে বলা হচ্ছে প্রেমের প্রস্তাব। ব্যর্থ হলে কোপাকুপি অথবা ভিডিও লোডের হুমকী। ভালোবাসা বা প্রেমের সংজ্ঞার এই করুন পরিনতি দেখতে সত্যিই আতঙ্কিত হতে হয়। প্রেমের নামে যৌনাকাঙ্ক্ষার এই ভ্রান্ত ব্যবহার মানুষের আবেগের এবং যৌক্তিক অবস্থানকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে।
তাই ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিহত করার এখনি সময়। প্রয়োজন শব্দের যথার্থ প্রয়োগ । সময়ের প্রয়োজনেই বদরুলদের ঔদ্ধত্য প্রশ্রয় পেয়ে বিকারে পরিণত করার রোগটি সারাতে হবে। অন্যথায় যৌনাকাঙ্ক্ষাকে প্রেম হিসেবে দাবীর এই অপব্যাখ্যা আর ভুল ব্যবহার অপরাধকে ঢেকে দেয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বদরুলদের কথাগুলোর অন্তর্নিহিত বার্তা এ সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ কথাগুলোর মাধ্যমে বদরুলরা যেন সমাজকে ভুল বার্তা দিয়ে হঠকারিতা করে কৌশলে নিজের সুবিধার দিকে না আনতে পারে। এরা যেনো আর এই সুযোগটি না পায় যে এই অপরাধের দায় খাদিজার উপরেও বর্তায়। এসব নিখুঁত ভাবে ভেবে দেখার এখনি সময়। অন্যথায় কোপ , ছুরির আঘাত , জখম নিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলে থাকা চাপাতিতে ক্ষতবিক্ষত নারীর দলিত মথিত এই শবদেহ ব্যবহৃত হবে এখন প্রতিদিনের সংবাদের হেডলাইন হিসেবে ।
লেখকের ইমেইল: sharminakhand007@yahoo.com
প্রতিনিধির নাম 





