
ডেস্ক নিউজ:গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে অনেক শঙ্কা ও উদ্বেগ ছিল, ফলাফল নিয়েও ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেসব কারণে এ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়ার ধারণা করা হয়েছে, তা হচ্ছে- প্রথমত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনকে টেস্ট কেস হিসেবে নিয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমেই তারা বুঝতে চেয়েছেন, প্রায় আট বছর ক্ষমতায় থেকে তাদের জনপ্রিয়তা কতটুকু অর্জিত হয়েছে? আর এ থেকেই পরবর্তী নির্বাচনগুলোর গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তা আঁচ করবে। দ্বিতীয়ত, সেলিনা হায়াৎ আইভী বিগত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন গতবার। এবার ছিল না দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের সাথে আইভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব থাকলেও কেন্দ্রের কঠোরতার কারণে আইভীর পক্ষেই জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেন তিনি। ক্লিন ইমেজধারী ও নারী প্রার্থী হিসেবেও আইভীর ছিল প্লাস পয়েন্ট। তবে নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলেও বিএনপির হারানোর কিছু নেই। উন্নয়ন ও সুশাসনের পক্ষে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইভীর ছিল সুদৃঢ় অবস্থান। তার বাবা আলী আহম্মদ চুনকাও ছিলেন নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এবারের বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন থেকেও বিগত নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার ছিলেন রাজনীতিতে বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রার্থী। সাখাওয়াত আইনজীবী হিসেবে পরিচিত হলেও বিএনপি নেতা হিসেবে ততটা হেভিওয়েট নন। তার ভরসা ছিল দলীয় প্রতীক। অবশ্য তিনি এক লাখের মতো ভোট পেয়েছেন।
আইভী ভাগ্যবান নারী। বিগত নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কতটুকু উন্নয়ন ও প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে তা নারায়ণগঞ্জবাসীই জানেন। তিনি সার্বিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ নারায়ণগঞ্জবাসীকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অনেকের ভাবনা ছিল, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতাসীন। দীর্ঘ দিন বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। তাই বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হলেও প্রভাবশালী আওয়ামী নেতাদের সাথে ফাইট করে ‘শান্তির জনপদ’ প্রতিষ্ঠা কঠিন।
বিএনপির প্রার্থী সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি করাটা স্বাভাবিক। আওয়ামী প্রার্থী আইভীও সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত দলের প্রার্থীর এমন অবস্থান মনে হয়েছে অসহায়ত্বের। আইভী হয়তো ভেবেছিলেন ‘তৃতীয় শক্তি’র ষড়যন্ত্রে হেরে যেতে পারেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম কারচুপির’ অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে এটি তাদেরও বক্তব্য হতো। বিজয়ী হওয়ার পর আইভী ফোন করে সাখাওয়াতের সাথে কথা বলেন। পর দিন তার বাসায় মিষ্টি নিয়ে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা সেখানে সময় কাটান। এ সময় নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে সাখাওয়াতের সহযোগিতা চাইলে তিনি সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনের আগে আইভী অঙ্গীকার করেছিলেন- যদি বিজয়ী বা পরাজিত হন, তিনি সাখাওয়াতের বাসায় যাবেন।
২৩ ডিসেম্বর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেশবাসীর নজরে এলো। সে দিন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে দেখতে হাসপাতালে ফুল নিয়ে যান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। হাসপাতালে প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থান করে মান্নার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। স্মৃতিচারণ করেন পুরনো দিনের। এ সময় বিএসএমএমইউর ভিসি কামরুল হাসানকে ফোন করে মান্নার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন কাদের। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ দিন আমরা এক সঙ্গে রাজনীতি করেছি। রাজনীতির বাইরেও একটা সম্পর্ক থাকে।’ সেনাবিদ্রোহে উসকানি ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রায় ২২ মাস কারাগারে আটক থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর জামিনে মুক্ত হন মান্না। গত ২১ ডিসেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন অসুস্থ মান্না।
মাহমুদুর রহমান মান্না এক সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আসীন থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বে তিনি নাগরিক ঐক্য নামে আলাদা দল গঠন করেন। নতুন দল গঠনের পর টকশোসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বিরুদ্ধেও কথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। এমন অবস্থানের পরও মান্নাকে দলের সাধারণ সম্পাদক হাসপাতালে দেখতে যাওয়া উদার তার দৃষ্টান্ত। এটা বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির বিরুদ্ধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই প্রত্যাশা।
বিএনপি এখন রাজনীতিতে অনেক ইতিবাচক ভূমিকায়। বিএনপি চেয়ারপারসন রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে নির্বাচন কমিশন গঠনে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। এ দিকে প্রধানমন্ত্রী দলের সম্মেলনে এমপিদের নির্দেশ দিয়েছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতাসীন হওয়ার লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনা। গণতন্ত্রমনা এ দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ চায় শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ধারাবাহিকতা।
বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে না পারায় দেশের মানুষ নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে। কিন্তু বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব নয়। জনগণ আশা করে ভবিষ্যতে সব নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হবে।
এক ছাত্রলীগ নেতার ফেসবুকে স্ট্যাটাস নজর কেড়েছে। তিনি আইভীর মতো ২০০ এমপি চান। দেশের মানুষ দুর্নীতি ও দুঃশাসন চায় না। চায় শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন। আমাদের সবার প্রত্যাশা বাংলাদেশ হোক অপার সম্ভাবনার। আমরা ৩০০ এমপি চাই, যারা ইতিবাচক রাজনীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হবেন।
আমরা আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক দলের দেশপ্রেম দেখেছি। গণতন্ত্রের প্রতি দেখেছি তাদের অবিচল আস্থা ও দৃঢ়তা। স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে গণতান্ত্রিকপ্রক্রিয়ায় তাদের ক্ষমতার পালাবদল হয়। নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান। বিজয়ী প্রার্থী সরকার পরিচালনায় পরাজিত প্রার্থীর সহযোগিতা কামনা করেন।
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হলেও রেশ কাটেনি। এ নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে। হয়তো আমরা ব্রিটেন কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনেও এমন প্রেক্ষাপট দেখব। অপর দিকে মনে হয় বদলে যাচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমরা উদার ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের পথে হাঁটছি হয়তো। আর তা থেকে পিছু হটছে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশ। নাসিক নির্বাচন একটি পথ দেখিয়ে দিয়েছে। একটি অনন্য দেশের স্বপ্ন দেখছি, যে দেশে থাকবে না বিদ্বেষ, থাকবে না হানাহানি। দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সবার অবস্থান হবে সুদৃঢ়। সরকার ও বিরোধী দল হোক পরস্পরের পরিপূরক। তবেই বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল অর্জিত হবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি
-
প্রতিনিধির নাম - আপডেট সময় : ১২:৪৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৭
- 330
ট্যাগস :






