
যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহরের বাসিন্দা ৪৩ বছরের সারাহ। ৪৫ বছরের স্বামী আর দুই কন্যাশিশু নিয়ে তার সংসার। যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে হুট করেই যখন প্রার্থিতার ঘোষণা দেন ট্রাম্প; বিষয়টি তার কাছে অনেকটা কৌতুকের মতো মনে হয়েছিল। ফলে ব্যাপারটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি সারাহ। কিন্তু ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বরের নির্বাচন ট্রাম্পের জয় তার ধারণা বদলে দেয়। এমনকি বিবিসি’র সঙ্গে তিনি যখন কথা বলছিলেন তখনও নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন এ নারী। সারাহ’র ভাষায়, নির্বাচনে যেটা ঘটেছে সেটা অকল্পনীয়।
আগামী মাসেই স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ছেন সারাহ দম্পতি। এরইমধ্যে দেশত্যাগ করেছেন কিংবা দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন এমন মানুষের সংখ্যাও নিতান্তই কম নয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই মানুষেরা কারা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে এই মানুষেরা হচ্ছেন ট্রাম্পের আমেরিকায় নিজেদের অরক্ষিত ভাবা লোকজন। নির্বাচনি প্রচারণায় যেসব জনগোষ্ঠী ট্রাম্পের আক্রমণের শিকার হয়েছে তারা এখন অধিকতর ভালো বিকল্প খুঁজছেন, দেশ ছাড়ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে থাকা স্বামীকে ফোন করেন উদ্বিগ্ন সারাহ। নির্বাচনের ফল সম্পর্কে স্বামীকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যেতে চাইছি। আমি মজা করছি না।’ তার স্বামীর উত্তর ছিল, ‘আমি জানি। আমরা যেতে পারি।’
গত সাড়ে তিন বছর ধরে বসবাসের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরটিকে আপন করে নিয়েছিলেন সারাহ দম্পতি। তবে পুরনো মায়া ছেড়ে আগামী মাসেই দুই কন্যাশিশুকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ছেন সারাহ দম্পতি। ট্রাম্পের আমেরিকা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরত্বের একটি দেশের উদ্দেশে পাড়ি দেবেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রে আর ফিরে যাওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই তাদের।
যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন ছিল ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। অনেকে আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন যে, ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে তারা দেশ ছাড়বেন। এখন আলোচিত এই ধনকুবের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেদের করণীয় সম্পর্কে ভাবছেন তারা। অফিস কিচেন, কফি শপ কিংবা ডিনার টেবিলে নিজেদের মধ্যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করেছেন ট্রাম্পের আমেরিকায় নিজেদের অরক্ষিত ভাবা শঙ্কিত মানুষেরা।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ে ১২টি অঙ্গরাজ্যে একযোগে ভোটাভুটিকে বলা হয় ‘সুপার টিউসডে’। একদিনে সবচেয়ে বেশি রাজ্যে ভোটাভুটি হওয়ায় দিনটিকে ‘সুপার টিউসডে’ বলা হয়। এতে অনেকাংশে পরিষ্কার হয়ে যায় বড় দুই দলের কোন প্রার্থী হোয়াইট হাউসের পথে এগিয়ে রয়েছেন। এবারের নির্বাচনের এই বিশেষ দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ১ মার্চ।
সুপার টিউসডে’র পরদিন গুগল জানায়, গুগলের ইতিহাসে অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ কানাডা যাওয়ার উপায় নিয়ে সার্চ করেছেন। ‘মুভ টু কানাডা’ লিখে গুগলে সার্চ দিয়েছেন সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ। একই সময়ে কানাডার অভিবাসন ও নাগরিকত্ব বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলোতে হিট করেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। একসঙ্গে এতো বেশি হিট পড়ার ফলে ওয়েবসাইটগুলোতেও সমস্যা তৈরি হয়। একপর্যায়ে ওয়েবসাইটগুলো সেখানে হিট করা ভিজিটরদের একটা বার্তা দেখানো শুরু করে। এতে লেখা ছিল, এই ওয়েবসাইটে প্রবেশে আপনার কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। আমরা এর সমাধানে কাজ করে যাচ্ছি। ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের ঘোষণা দেওয়া মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তবে ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর এদের অনেকে নিজেদের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। সিদ্ধান্ত বদলানো মানুষের তালিকায় মাইলি সাইরাসের মতো তারকারাও রয়েছেন।
সিদ্ধান্ত বদলানো মানুষদের কারও হয়তো দেশত্যাগের ভালো বিকল্প ছিল না। কেউবা আবার চূড়ান্তভাবে নিজের দীর্ঘদিনের বাসস্থান ছেড়ে যেতে শেষ পর্যন্ত আগ্রহী হননি। আবার দেশে থেকেই ট্রাম্পের মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন অনেকে। তবে শুধু লোকজনের দেশ ছাড়াই নয়; পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক প্রবণতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পরপরই নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে দেশটির প্রধান পুঁজিবাজার ওয়াল স্ট্রিটের সূচক। নির্বাহী আদেশে ১২টি দেশের এ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এ ঘোষণার পর ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগের আগে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে শুরু করেন বিনিয়োগকারীরা। বিশ্ববাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ভয়ের কারণ শুধু টিপিপি বাতিলই নয়। নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফটা) পর্যালোচনারও ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব অনুধাবন করতে চাইছেন বিনিয়োগকারীরা। আর এটা যদি নেতিবাচক হয় তাহলে হয়তো বাসস্থানের মতো বিনিয়োগের জন্যও বিকল্প খুঁজতে হবে অনেক মার্কিন নাগরিককে। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।
প্রতিনিধির নাম 




