ঢাকা ০২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মশা যখন জাতীয় সমস্যা: তারেক রহমানের বক্তব্য ও কার্যকর প্রতিরোধের পথ লেখক: তাজ উদ্দীন হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন গোলাম মাহমুদ আজম ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাজ্যে ২ ট্রেনের সংঘর্ষে চালক নিহত বগুড়ার ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর গানের গহীনে: জাতীয় সংগীত বিতর্ক: তাজ উদ্দীন বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিতে ভাষা শিক্ষায় জোর প্রধানমন্ত্রীর, সারা দেশে খুলবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড: ১০ মার্চ উদ্বোধনের ঘোষণা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ, দেশবাসীকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান

রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে আটকে তিস্তার ন্যায্য পানির হিস্যা

উত্তরের পাঁচ জেলার জীবনরেখা তিস্তা নদী এখন কার্যত পানিশূন্য। ভারতের সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে নদীটি। অথচ দুই মাসের ব্যবধানে তিস্তার চিত্র আমূল পাল্টে গেছে। বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে খরায় বিপর্যস্ত হচ্ছে তিস্তাপাড়ের জনজীবন।

নদীর পানি সরে যাওয়ায় পাঁচ জেলার ৭৩৪টি চরের প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে রবি ফসলের চাষ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা। তবে প্রয়োজনীয় সেচের পানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি নেই। নির্বাচনের আগে তিস্তা হয়ে ওঠে ভোটের ইস্যু, আর নির্বাচন শেষে হারিয়ে যায় প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা এখন কার্যত ভোটের রাজনীতিতে ‘দাবার গুটি’তে পরিণত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, প্রতিবছর তিস্তা নদী প্রায় দুই কোটি টনের বেশি পলি বহন করে আনছে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে স্বল্প পানিতেই বন্যা দেখা দিচ্ছে। রংপুরের কাউনিয়ায় বিপৎসীমা ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ নেমে আসে ২০০ কিউসেকের নিচে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজন অন্তত ১০ হাজার কিউসেক।

যৌথ নদী কমিশন জানায়, ১৯৮৭ সাল থেকেই ভারত একতরফা ভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি হলেও পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই, তবে এটি ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরিতে জরুরি।

তিস্তাপাড়ের কৃষকরা জানান, পানি সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সেনিক ঝুঁকি, হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্য সম্পদ। পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নদী গবেষকরা মনে করছেন, শুধু পানির ন্যায্য হিস্যা নয়, তিস্তা নদীর সুরক্ষা, খনন ও চর রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় উজানের পলিতে নদী ভরাট হয়ে প্রতিবছরই অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা ও ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই, এবার কি প্রতিশ্রুতি বাস্তবতায় রূপ নেবে, নাকি তিস্তা আবারও থেকে যাবে রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হয়েই?

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মশা যখন জাতীয় সমস্যা: তারেক রহমানের বক্তব্য ও কার্যকর প্রতিরোধের পথ লেখক: তাজ উদ্দীন

রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে আটকে তিস্তার ন্যায্য পানির হিস্যা

আপডেট সময় : ০১:৫৪:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

উত্তরের পাঁচ জেলার জীবনরেখা তিস্তা নদী এখন কার্যত পানিশূন্য। ভারতের সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে নদীটি। অথচ দুই মাসের ব্যবধানে তিস্তার চিত্র আমূল পাল্টে গেছে। বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে খরায় বিপর্যস্ত হচ্ছে তিস্তাপাড়ের জনজীবন।

নদীর পানি সরে যাওয়ায় পাঁচ জেলার ৭৩৪টি চরের প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে রবি ফসলের চাষ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা। তবে প্রয়োজনীয় সেচের পানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি নেই। নির্বাচনের আগে তিস্তা হয়ে ওঠে ভোটের ইস্যু, আর নির্বাচন শেষে হারিয়ে যায় প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা এখন কার্যত ভোটের রাজনীতিতে ‘দাবার গুটি’তে পরিণত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, প্রতিবছর তিস্তা নদী প্রায় দুই কোটি টনের বেশি পলি বহন করে আনছে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে স্বল্প পানিতেই বন্যা দেখা দিচ্ছে। রংপুরের কাউনিয়ায় বিপৎসীমা ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ নেমে আসে ২০০ কিউসেকের নিচে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজন অন্তত ১০ হাজার কিউসেক।

যৌথ নদী কমিশন জানায়, ১৯৮৭ সাল থেকেই ভারত একতরফা ভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি হলেও পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই, তবে এটি ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরিতে জরুরি।

তিস্তাপাড়ের কৃষকরা জানান, পানি সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সেনিক ঝুঁকি, হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্য সম্পদ। পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নদী গবেষকরা মনে করছেন, শুধু পানির ন্যায্য হিস্যা নয়, তিস্তা নদীর সুরক্ষা, খনন ও চর রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় উজানের পলিতে নদী ভরাট হয়ে প্রতিবছরই অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা ও ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই, এবার কি প্রতিশ্রুতি বাস্তবতায় রূপ নেবে, নাকি তিস্তা আবারও থেকে যাবে রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হয়েই?