উত্তরের পাঁচ জেলার জীবনরেখা তিস্তা নদী এখন কার্যত পানিশূন্য। ভারতের সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে নদীটি। অথচ দুই মাসের ব্যবধানে তিস্তার চিত্র আমূল পাল্টে গেছে। বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে খরায় বিপর্যস্ত হচ্ছে তিস্তাপাড়ের জনজীবন।
নদীর পানি সরে যাওয়ায় পাঁচ জেলার ৭৩৪টি চরের প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে রবি ফসলের চাষ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা। তবে প্রয়োজনীয় সেচের পানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি নেই। নির্বাচনের আগে তিস্তা হয়ে ওঠে ভোটের ইস্যু, আর নির্বাচন শেষে হারিয়ে যায় প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা এখন কার্যত ভোটের রাজনীতিতে ‘দাবার গুটি’তে পরিণত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, প্রতিবছর তিস্তা নদী প্রায় দুই কোটি টনের বেশি পলি বহন করে আনছে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে স্বল্প পানিতেই বন্যা দেখা দিচ্ছে। রংপুরের কাউনিয়ায় বিপৎসীমা ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ নেমে আসে ২০০ কিউসেকের নিচে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজন অন্তত ১০ হাজার কিউসেক।
যৌথ নদী কমিশন জানায়, ১৯৮৭ সাল থেকেই ভারত একতরফা ভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি হলেও পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই, তবে এটি ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরিতে জরুরি।
তিস্তাপাড়ের কৃষকরা জানান, পানি সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সেনিক ঝুঁকি, হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্য সম্পদ। পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নদী গবেষকরা মনে করছেন, শুধু পানির ন্যায্য হিস্যা নয়, তিস্তা নদীর সুরক্ষা, খনন ও চর রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় উজানের পলিতে নদী ভরাট হয়ে প্রতিবছরই অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা ও ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই, এবার কি প্রতিশ্রুতি বাস্তবতায় রূপ নেবে, নাকি তিস্তা আবারও থেকে যাবে রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হয়েই?
আব্দুর রহমান প্রতীক 

