চট্টগ্রাম: সমুদ্র পথের পরিবর্তে এবার মানব পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর। ৩০ জনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে লিবিয়া ইটালিতে পাচার হচ্ছে উঠতি বয়সের তরুণরা। এ সিন্ডিকেটের মধ্যে সাদিক ও মোজাম্মেল লিবিয়ায় অবস্থান করে।
দেশের সমুদ্র পথে মানব পাচার রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির পর এবার বিমান বন্দরকেই নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে পাচারকারী সিন্ডিকেট।
জাল ভিসা দিয়ে বিমান বন্দরের মাধ্যমে নিরাপদে এসব লোককে লিবিয়া ও ইতালি পৌঁছে দেয়ার কথা বলে নিয়ে যাচ্ছে। ভিসার মেয়াদ না থাকলেও কিভাবে এসব যুবক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন চেক পোস্ট অতিক্রম করে বাংলাদেশ ত্যাগ করছে তা ভাবিয়ে তুলেছে র্যাবসহ সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রাম বিমান বন্দর কেন্দ্রিক মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইনজীবীও। বুধবার (১৮ জানুয়ারি) মানব পাচার মামলায় চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামাল হোসেন (৪০) ও স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার (৩২) জামিন না দেয়ায় আদালতে ভাঙচুর করে আইনজীবীরা। চট্টগ্রাম আদালত ভবনে নজিরবিহীন ভাঙচুর ও বিক্ষোভের পর মানবপাচার আইনের মামলার আসামি আইনজীবী ও তার স্ত্রীকে জামিন দেন আদালত। ওই দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম সাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়া তাদের জামিন নামঞ্জুর করলে বিক্ষোভে নামেন আইনজীবীরা। এ সময় বিচারকের এজলাস এবং খাস কামরার জানালায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এরপর সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে শুনানির পর মহানগর হাকিম মাসুদ পারভেজ তাদের জামিন মঞ্জুর করেছেন।
১৮ জানুয়ারি বুধবার সকালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দর থেকে ১৪ বিমান যাত্রীকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে সাতজন নারী। বিমানে ওঠার জন্য ইমিগ্রেশনে হাজিরের পর তাদের আটক করা হয়। এরা ভুয়া ওমরাহ যাত্রী বলে জানিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। সকাল ৯টায় এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে তাদের সৌদিআরব যাওয়ার কথা ছিল। তাদের পাসপোর্ট, ভিসা ঠিক থাকলেও ওমরা হজে ও নিয়ম অনুয়ায়ী নিকটাত্মীয় না থাকায় তাদের আটকে দেয়া হয়।
ইমিগ্রেশন শাখার পুলিশ সুপার মো.শাহরিয়ার আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব যাওয়ার চেষ্টা করছিল সাত নারী। নিয়ম অনুযায়ী তাদের সঙ্গে একজন করে মাহরাম (নিকটাত্মীয়) যেতে হবে। কিন্তু তারা যে সাত পুরুষকে সঙ্গে এনেছে তারা কেউই নিকটাত্মীয় নন।
এতে আমাদের সন্দেহ হলে আমরা ইমিগ্রেশন স্থগিত করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি। তারা স্বীকার করেছে সাতজন কেউই তাদের নিকটাত্মীয় নন। ধারণা করছি এরা সবাই দালাল।
গত ১২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকালে অবৈধভাবে লিবিয়া যাওয়ার সময় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর থেকে ৩৯ জনকে র্যাব আটক করার পর এ তথ্য বেরিয়ে আসে। এদের মধ্যে ১৯ জনকে বিমান বন্দরের ভিতরে এবং ২০ জনকে বাইরে অপেক্ষমান অবস্থায় ছিল। আটককৃতদের অধিকাংশই যুবক ।
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্ণেল মেফতাহ উদ্দিন জানান, সেদিন আরও ২১ জন সকালের একটি ফ্লাইটে লিবিয়ার উদ্দেশ্য দুবাই চলে গেছে। আরও ৭০ জন একই পথে যাওয়ার কথা ছিল বলে তিনি জানান। বিমান ছেড়ে দেওয়ায় তাদেরকে আটকানো সম্ভব হয়নি।
আর্ন্তজাতিক মানব পাচারকারী দালাল সিন্ডিকেটের সদস্য সাদিক এবং মোজাম্মেলের মাধ্যমে এসব লোক লিবিয়া ও ইটালি পাচার হচ্ছিল। আটক হওয়া ঢাকার বাসিন্দা মেহেদি হাসান জানান, ৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় লিবিয়া ও ইটালি পৌঁছে দেয়ার চুক্তি হয় তাদের উক্ত সিন্ডিকেটের সঙ্গে। লিবিয়া পৌঁছলে টাকা পরিশোধ করার কথা।
কিভাবে এ সিন্ডিকেটকে বিশ্বাস করলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে মেহেদি বলেন, আগে আরও লোক পাঠিয়েছে তারা।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত ৩০ জনের একটি পাচারকারী সিন্ডিকেট এর সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে র্যাব। আটক ৩৯ জনের কাছ থেকে বেশ কিছু পাসপোর্ট এবং জাল ভিসা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ভিসার বেশীর ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ।
এ ঘটনার সঙ্গে সিলেটের আল মামুন ট্রাভেলস এবং শামিম ট্যুরস নামে দুটি ট্রাভেল এজেন্সি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে র্যাব। তবে বিমান বন্দরের কোনো কর্মকর্তা জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে আটক শরীয়তপুরের শামীম জানান, ইতালি যাওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। বাকি টাকা ইতালি পৌঁছার পর দেওয়ার কথা।
তাদেরকে একদিনের নোটিশে নিজ নিজ গ্রাম থেকে প্রথমে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে একসাথে করে সবাইকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়।
র্যাব কমকর্তা মিফতাহ উদ্দিন জানান, চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে দুবাই এর পর তুরস্কের আঙ্কারা এয়াপোর্ট হয়ে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে পৌঁছে দেয়া হয় তাদেরকে।
প্রতিনিধির নাম 